জীবন সংগ্রামে জয়ী ও সফল একজন নারী কেন্দুয়ার কল্যাণী হাসান

মহিউদ্দিন সরকার, কেন্দুয়াঃ আবহমান বাংলায় যুগ যুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী সমাজ লাঞ্চিত,বঞ্চিত, নিপীড়িত, প্রতিকূল পরিবেশেও অনেক নারী নিজের শ্রম ও মেধা কাটিয়ে  সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে নিজেকে তুলে ধরেছেন। অনেকে হয়েছেন নারী জাগরণের অগ্রদুত ।  তেমনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় জীবন সংগ্রামে সফল ও প্রতিষ্ঠিত একজন নারী কল্যাণী হাসান । শৈশব থেকে নিজের জীবনের সাথে-প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ-সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।



তিনি কেন্দুয়া পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি কামরুল হাসান ভূঞার সহধর্মিনী । তাঁর সাফল্যে নেপথ্যে রয়েছে সু বিনস্ত এক ইতিহাস । মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ প্রতিনিধির সঙ্গে একান্ত আলাপকালে কল্যাণী হাসান বলেন-তিনি জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত মায়ের দুধটুকু ছাড়া কোন কিছুই কষ্ট ছাড়া পাই নি। তবু কখনো হাল ছাড়িনি । শিক্ষা জীবনে বাবা কখনোই আমাকে বই কিনে দিতে পারতেন না। শুধু বই কেন ? দুই বোন এক ভাইয়ের সংসারে বাবা নিয়মিত ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারতেন না। দু-বেলা পেট ভরে ভাত খেয়েছি-এমন দিন আমার ছোট বেলায় কমই ছিল । তাই  সবাই মিলে আমাকে ৮ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে দিতে চেয়েছিল। অনেক কষ্টে সেদিন প্রতিবাদ করেছিলাম। তারপরও সৃষ্টিকর্তা আমাদের বাচিঁয়ে রেখেছেন । আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার জন্য লাখ লাখ শোকরীয়া । আমার ছোট বোন শিক্ষক। বড় ভাই একজন ব্যবসায়ী। আমি নিজে মোটামোটি আজ প্রতিষ্ঠিত । এই কঠিন সময়ে যিনি শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেনতিনি আমার মমতাময়ী মা। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি কিভাবে লক্ষ্যে পৌঁছতে হয় ।

জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী নারী কল্যাণী হাসান শিক্ষা জীবনে  ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি,এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি-তে স্টার মার্কসসহ আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ থেকে বিএসসি(অনার্স) ও এম.এস.সি(মাস্টার্স)ভালো ভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছেন । তিনি ২০০০ সালে এম,এস,সি পড়া অবস্থায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান । চাকুরীর পাশাপাশি ২০০২ সালে কেন্দুয়া সদরে “মা জুয়েলার্স” নামে একটি জুয়েলারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। এ ব্যবসা শুরু করার সময় মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা মূলধন আর মনোবলই ছিল তাঁর একমাত্র সাথী । কেন্দুয়ায় তখন খুব কম মহিলারা বাজারে আসা-যাওয়া করতেন। এ অবস্থায়  একজন মহিলা বাজারে বসে ব্যবসা করবে এটা তখনকার সময়ে মানুষজন মেনে নেওয়া তো দূরের কথা,তা ভাবতেই পারতেন না। তাই প্রতিনিয়তই নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। জুয়েলারী ব্যবসা সাধারণত খুব ঝুকিপূর্ণ। কেননা-এতে সততা,আন্তরিকতা,ধৈর্য্য ও অর্থের প্রয়োজন । আর এই ব্যবসা পুরুষের পাশাপাশি কোন নারী করতে পারে,মানুষকে এটা বুঝাতে কল্যাণী হাসানের ৩/৪ বছর লেগেছিল। সেই কল্যাণী হাসান বর্তমানে কেন্দুয়া বাজারের জুয়েলারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। প্রথমদিকে তাঁর শুশুর বাড়ীর লোকজনও তা মেনে নিতে চাননি । তাই সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম সেরে এবং স্কুল ছুটির পর তাঁেক তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসতে হতো। তবে এ ব্যাপারে তার স্বামী  তাঁেক এ কাজে বিশেষভাবে সহায়তা করেছেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর কল্যাণী হাসান আজ একজন সফল ব্যবসায়ী । বর্তমানে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ৬/৭ জন লোক কাজ করছেন। তাঁকে দেখে আজ কেন্দুয়া সদরে অনেক নারী ব্যবসায়ী ব্যবসা করছেন । তাদের ভাল-মন্দ দেখার বিষয়টি তিনি নিজের মনের তাগিদেই করে থাকেন।

কল্যাণী হাসান  আরও  বলেন ২০০৫ সালে অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে আমি জয়িতা পুরস্কার পেয়েছি । ২০১৬ সালে আনসার ভিডিপি একাডেমী থেকে সফল নানী উদ্যোক্তার পুরস্কারসহ আরো একাধিক পুরস্কার পেয়েছি ।

ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান-ব্যক্তিগত জীবনে আমি এক কণ্যা অদিতি সরকার ঝরা(১৫+) এবং একপুত্র ভূইয়া রাহুল হাসান সাম্য(৭+) সন্তানের জননী। আমার অতীত জীবনের কষ্ট আমার সন্তানদের বেলায় ফিরে আসুক তা আমি চাই না। শুধু আমার সন্তান নয় –সমাজের কোথাও যদি কেউ  ( আমার জানামতে) সমস্যায় পড়ে,যেমন-স্কুল,কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বা ফরম ফিলাপ করতে না পারে বা অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য ,কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা-মাতার পাশে দাড়াঁনো ,অসহায় সম্বলহীন মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি আমার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসময় তিনি আরও বলেন-অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিক পরিবারের বউ হওয়ার কারণে -যেখানে যে অবস্থাতেই নারী নির্যাতিত হয় (রাতে-দিনে) সেখানেই স্ব-শরীরে উপস্থিত হতে সর্বদা সচেষ্ট থাকি । নারী নির্যাতন বন্ধ,সঠিক বয়স্কভাতা,বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা,মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রাপ্তি, শিশুর পুষ্ঠি ও শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি নিশ্চিতকরণ ও ঝরে পড়া রোধে যথাসাধ্য কাজে করে যাচ্ছি । এছাড়াও তিনি বলেন-নিজে বাল্য বিয়ের হাত থেকে মুক্ত হয়েছিলাম বলেই আজ আমি প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যের জন্য কাজ করতে পারছি । সেই অনুপ্রেরণা থেকেই বাল্য বিয়ে বন্ধে রাত-দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছি । আজ পর্যন্ত  প্রশাসন ও উপজেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সহায়তায় ৫০ টির বেশী বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। উপজেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সাঃ সম্পাদক হওয়ায় বিভিন্ন স্কুল,মাদ্রাসা ও কলেজে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে এবং পাড়া-মহল্লায় কাউন্সিলিং ও উঠান বৈঠক করে থাকি । সর্বদাই মা বোনদের বুঝাতে চেষ্ঠা করি যে,মেয়েদের ১৮ বছর ও ছেলেদের ২১ বছররের আগে বিয়ে করানো অন্যায় । তাই উপজেলা জুড়ে আমাকে বাল্য বিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধের আতংক বলে সম্বোধন করেন ।

পরিশেষে তিনি এ প্রতিনিধিকে বলেন-একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে নিজেকে নারী নয় মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠি করতে চাই এবং সমাজের অন্যান্য নারীদের মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবো আমৃত্যু ।